হাওরের জেলাগুলোতে গত এক দশকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ফসল রক্ষার নামে যেখানে-সেখানে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। যার কারণে হাওর থেকে বৃষ্টি পানি নামার রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যান্য বছর উজানের ঢলে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তলিয়ে যায়; এবার সেভাবে বাঁধ না ভাঙলেও ওই বাঁধকেই ফসলহানির জন্য দায়ী করছেন কৃষকরা।
বাঁধ বাস্তবায়নকারী সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোও-র একজন কর্মকর্তাও বলেছেন, হাওরে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ‘যত্রতত্র উন্নয়ন’।
হাওরের কৃষকরা জানান, হাওরের তীরবর্তী যে উঁচু জমি বর্ষায় ডুবে থাকে, তাকে বলা হয় জাঙ্গাল। শুকনো মৌসুমে ওই জাঙ্গাল কেটে সেই মাটি বাঁধে দেওয়া হয়।বর্ষায় সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে হাওর সংলগ্ন খাল ও নদীতে গিয়ে পড়েছে এবং ভরাট হয়ে পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে উজান থেকে যখন ঢল নামছে, সেই পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ পাচ্ছে না। টানা বৃষ্টিতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। তাতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।
শুরুর দিকে অনেক হাওরে কৃষক শত শত শ্যালো মেশিন বসিয়ে সেই পানি সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন বৃষ্টি বেশি হয়, হাওর ভেসে যায়, তখন কৃষক বা পাউবো কারো আর কিছু করার থাকে না।

এদিকে হাওর অঞ্চলের অভিজ্ঞ কৃষকরা সংবাদমাধ্যমকে জানান, হাওরের মানুষ বর্তমান অবস্থাকে ‘কাঁচইরা’ (‘কাঁচা বছর’ বা বৃষ্টি-বাদলের বছর) বলেন। এবার হাওরে ‘কাঁচইরা বছর’ চলছে। বৃষ্টির পানিতে এরকম জলাবদ্ধতা ৫-১০-১৫-২০ বছর পর পর হয়। ভালো বছরকে হাওরে বলে, ‘সোনার বৈশাখ’।
এবার ফাল্গুন মাস থেকে হাওরে বৃষ্টি চলছে। বৃষ্টিতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই নিম্নাঞ্চলের কাঁচা ফসল ডুবে নষ্ট হয়েছে। তখন বিভিন্ন হাওরে পাম্প লাগিয়েও সেচ দিয়েছেন কৃষকরা। সেচের জন্য সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল নগদ অর্থও দিয়েছিলেন।
জামালগঞ্জের হালির হাওর ও পাগনার হাওরে শত শত পাম্প লাগিয়ে পানি নিষ্কাশন করেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু ২৫ এপ্রিলের পর শুরু হয় টানা বর্ষণ। বিশেষ করে ২৭ এপ্রিলে ভয়াবহ বর্ষণে সব হাওরের ফসল ডুবে গেছে।
২০১৭ সালে কৃষকদের দাবির মুখে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। ২০১৮ সাল থেকে হাওরে কৃষক, পাউবো, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসির মাধ্যমে হাজার হাজার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মিত হচ্ছে।
অভিযোগ আছে, এই সুযোগে হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি নষ্ট করে নির্বিচারে যত্রতত্র বাঁধ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবছরই বাঁধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাটি কাটার পরিমাণ। অপরিকল্পিত বাঁধের সঙ্গে বাঁধের বিপুল মাটি প্রতি বছর হাওরে, নদীতে, খালে ও জলাশয়ে এসে পড়ছে।

পাউবো সুনামগঞ্জের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৭১৮টি প্রকল্পের আওতায় জেলায় প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে ৩১ লাখ ২১ হাজার ঘনমিটার মাটি কাটা হয়েছে।
এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ১৪৫ কোটি টাকার ৬৮৪টি প্রকল্পে মাটি কাটা হয়েছিল ৩০ লাখ ৪০ হাজার ৩৮৮ ঘনমিটার।
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ৬০০ মিটার বাঁধ নির্মাণে ৭৩৪টি প্রকল্পের আওতায় ১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেসব প্রকল্পে ৩২ লাখ আট হাজার ২৩৩ ঘনমিটার মাটি ব্যবহার হয়েছিল।
তিন বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই হাওরে দুই হাজার ১৩৬টি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার হয়েছে। যাতে ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি ব্যবহার হয়েছে।
মাটি কাটার ফলে এক দিকে হাওরের জাঙ্গাল, উঁচু জমি, বন, গাছগাছালি ও জীববৈচিত্র নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে সেই মাটিতেই হাওরের জলমহাল, হাওর, হাওর ঘেঁষা নদী ও খাল ভরাট হয়েছে। সব মিলিয়ে বাঁধই এখন ফসলহানির একমাত্র কারণ বলে মনে করছেন অনেক কৃষক।
অবশ্য পাউবোর এই মাটির হিসাব নিয়ে কৃষকদের অন্য অভিযোগও রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিপুল বরাদ্দ হাতিয়ে নিতে কাগজে-কলমে ওই মাটি কাটার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ কম।
এদিকে পাউবোর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। ২০২৫ সালের ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল রেকর্ডে দেখা যায়, ওই সময়ে জেলার প্রধান সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে যথাক্রমে ৩.৫৯, ৩.৪৬, ৩.৩৭ ও ৩.২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়েছিল।
এ বছর ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি (সকাল ৯টার হিসাব) যথাক্রমে ৩.৫১, ৩.৮৬, ৪.৩৬ ও ৪.৫৪ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
একইভাবে গত বছর এই সময়ে বৃষ্টিপাত ছিল একেবারে কম। এ বছর ২৫ এপ্রিল থেকেই ভারী বর্ষণ হচ্ছে।
২৭-২৮ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড় পয়েন্টে ১৩৩ মিলিমিটার, ছাতক পয়েন্টে ৭৬ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১৩৭ মিলিমিটার এবং দিরাই পয়েন্টে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অথচ গত বছর ২৮ এপ্রিলের পরিসংখ্যানে মাত্র ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পরের দিন থেকে ওই বছর মাত্র ছয় ও এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।

অন্যদিকে, অ্যাস্যোসিয়েটস ফর ইনোভেটিভ রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এআইআরডি) পরিচালক ও পিএইচডি গবেষক আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যার দীর্ঘদিনের এ সংকটের পেছনে রয়েছে নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি। কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) ও পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) মতো ত্রুটিপূর্ণ নীতির আওতায় বছরের পর বছর হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই কাজগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি, অদক্ষতা ও জবাবদিহিতার অভাবের কারণে বাঁধগুলো টেকসই হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, সামান্য পাহাড়ি ঢলেই বাঁধ ভেঙে যায় এবং বারবার ফসলহানির ঘটনা ঘটে ‘
হাওর ও জলাভূমি অধিদপ্তরকে ‘কাগুজে অস্তিত্ব’ থেকে বের করে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর না করলে এই সংকট দূর হবে না বলে মনে করেন গবেষক আব্দুল হাই চৌধুরী।
পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘হাওরে যত্রতত্র উন্নয়ন জলাবদ্ধতার অনতম কারণ।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, জলাবদ্ধতায় প্রায় ১৫ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে এবার। ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘হাওর রক্ষা করতে হলে হাওর মন্ত্রণালয় গঠন করে হাওরের মানুষের মতামত নিয়ে সব ধরনের উন্নয়ন করতে হবে। হাওরের চরিত্র, প্রকৃতি বুঝে কাজ না করলে আগামীতে হাওর আরো প্রতিশোধ নেবে।’
তবে জরুরি ভিত্তিতে হাওর রক্ষা করতে হলে নদী, খাল, জলাশয় খনন করতে হবে বলে জানান তিনি। এরই মধ্যে হাওরে খাল খনন শুরু করা হয়েছে বলে জানান সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।