ইলন মাস্কের দাবি ওপেনএআই তাঁর আইডিয়া

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এর প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। তার অভিযোগ, মানবতার কল্যাণে কাজ করার যে মূল লক্ষ্য নিয়ে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা থেকে সরে গিয়ে তারা মাস্ক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে তারা মুনাফালোভী ‘দানবে’ পরিণত করেছেন।

মঙ্গলবার আদালতে মামলার সাক্ষ্য দিয়েছেন ইলন মাস্ক। সেসময় এইকথাগুলো বলেছেন তিনি। মাস্ক চ্যাটজিপিটি নির্মাতাদের বিরুদ্ধে নিজের মামলাটিকে ‘দাতব্য কার্যক্রম রক্ষার লড়াই’ হিসেবেই দাবি করেছেন।

মামলার প্রথম দিন আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে মাস্ক বলেন, ‘আমরা যদি কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান (চ্যারিটি) লুট করাকে বৈধতা দিই, তবে যুক্তরাষ্ট্রে এমন কাজের পুরো ভিত্তিটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এটাই আমার বড় ভয়।’

ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং মহাকাশযান নির্মাতা কোম্পানি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক দাবি করেন, ওপেনএআই মূলত তারই মস্তিষ্কপ্রসূত।

তিনি বলেন, ‘এই আইডিয়া, এই নাম—সবই আমার দেওয়া। আমিই গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে নিয়োগ দিয়েছিলাম, আমি যা জানতাম তার সব শিখিয়েছিলাম এবং শুরুর দিকের পুরো তহবিল আমিই দিয়েছিলাম। এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, যা থেকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি লাভবান হবেন না। আমি চাইলে এটিকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই শুরু করতে পারতাম, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই তা করিনি।’ 

তবে মাস্কের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে ওপেনএআই ও অল্টম্যানের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট আদালতে দাবি করেন, ‘ওপেনএআইয়ের শুরুর দিকে মাস্কের চোখেই মূলত ডলারের স্বপ্ন ছিল। তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে তিনি এর সিইও হতে পারেন।’

স্যাভিট আরও বলেন, ‘মাস্ক মূলত ‘রাজত্বের চাবি’ চেয়েছিলেন। আর যখন তিনি ব্যর্থ হন, তখনই তিনি এই মামলা করেছেন। ২০২৩ সালে মাস্ক নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন স্পেসএক্সের অংশ।’

ইলন মাস্কের একমাত্র চিন্তা হলো কীভাবে সবকিছুর শীর্ষে থাকা যায়-এমনটি উল্লেখ করে স্যাভিট বলেন, মাস্ক তার নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে পারেননি বলেই আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।’

আরও পড়ুন  মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে ছড়ানো মহাজাগতিক গ্যাসের জাল

স্যাভিটের দাবি, গুগলের ‘ডিপমাইন্ড’ এআই ল্যাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শীর্ষ বিজ্ঞানীদের বেতন দেওয়া এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা কিনতে ওপেনএআইকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান বানানো জরুরি ছিল।

অন্যদিকে মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো জুরিদের বলেন, ‘ওপেনএআইয়ের কর্মকর্তারা আসলে লোভে পড়েছিলেন। মাইক্রোসফটের ১০ বিলিয়ন ডলারসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের টাকা আসতে শুরু করলে তারা এই পথ বেছে নেন।’

বুধবার মাস্কের আবারও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি। 

ইলন মাস্ক ওপেনএআই এবং এর অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের কাছ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এই অর্থ ওপেনএআইয়ের দাতব্য শাখায় জমা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

পাশাপাশি তিনি চান, ওপেনএআই আবার আগের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাক এবং অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে দায়িত্ব থেকে সরানো হোক।

এদিকে, জুরিরা আসন নেওয়ার আগেই ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ ইভন গঞ্জালেজ রজার্স ইলন মাস্ককে ভর্ৎসনা করেন।

এর আগে সোমবার মাস্ক তার সামাজিক মাধ্যম এক্সে অল্টম্যানকে ‘স্ক্যাম অল্টম্যান’ (প্রতারক) বলে কটাক্ষ করেন এবং তার বিরুদ্ধে চ্যারিটি চুরির অভিযোগ তোলেন। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

বিচারক রজার্স বলেন, তিনি মাস্কের মুখ বন্ধ করার কোনো নির্দেশ দিতে চান না। তবে তিনি মাস্ককে সতর্ক করে বলেন, ‘আদালতের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কথা বলার যে ঝোঁক আপনার রয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন।’

এরপর মাস্ক সামাজিক মাধ্যমে তার কার্যকলাপ কমিয়ে আনতে সম্মত হন। একই বিষয়ে সম্মত হন স্যাম অল্টম্যানও। এই মামলায় অল্টম্যান এবং মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলারও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

ব্রকম্যানের অ্যাপার্টমেন্টে শুরু হওয়া একটি অলাভজনক গবেষণা ল্যাব থেকে ওপেনএআই কীভাবে ৮৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি কোম্পানিতে পরিণত হলো, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় তার অনেক কিছুই উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই মামলার কারণে ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন উঠেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর পরিকল্পনা জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন  জামালপুরে গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণ মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

মানবতার কল্যাণে এআইয়ের উন্নয়ন এবং গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঠেকাতে ২০১৫ সালে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাস্ক ও অল্টম্যান।

সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মাস্ক বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরেই এআই নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের সঙ্গে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আমরা এআই নিরাপত্তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। একসময় আমি বুঝতে পারি, ল্যারি পেজ এআই নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না… তাই গুগলের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মতো আমাদের একটা কিছু দরকার ছিল।’

তবে ওপেনএআইয়ের আইনজীবী স্যাভিট তার বক্তব্যে দাবি করেন, ‘এআই নিরাপত্তা কখনো মাস্কের কাছে অগ্রাধিকার পায়নি। মাস্ক উল্টো ওপেনএআইয়ের যেসব কর্মী এই বিষয়টিতে জোর দিতেন, তাদের অপমান করতেন। মাস্ক তাদের গাধা বলে ডাকতেন।’

মাস্ক বলেছেন, ওপেনএআইয়ের প্রাথমিক লক্ষ্যের জন্য তিনি প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মাইক্রোসফটের নাদেলা এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বলে আদালতে জানান।

মাস্ক বোর্ড ছাড়ার ১৩ মাস পর ওপেনএআই তাদের লাভজনক শাখাটি তৈরি করে।

ওপেনএআই বর্তমানে অ্যানথ্রপিকসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে এবং কম্পিউটার সংক্রান্ত সম্পদের পেছনে শত শত কোটি ডলার খরচ করছে।

রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, একটি সম্ভাব্য আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটির মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে মাস্কের এক্সএআই এখনো ওপেনএআইয়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। তবে তিনি এই ব্যবসাকে স্পেসএক্সের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এ বছর স্পেসএক্সের সম্ভাব্য আইপিও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

  • ইলন মাস্ক
  • ওপেনএআই
  • প্রযুক্তি
  • মামলা