টানা বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধির কারণে হাওরে বন্যার পূর্ভাস দেখছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) । এদিকে টানা বৃষ্টির কারণে বোরো ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, এখনো প্রায় অর্ধেক ফসল মাঠে রয়ে গেছে এবং এর প্রায় ১৭ শতাংশ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, আর দুই-এক দিন এভাবে বৃষ্টি হলে জমি পুরোপুরি ডুবে যাবে। তখন আর ধান কাটা সম্ভব হবে না। যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও শুকানো যাচ্ছে না। আর তিন-চার দিন এমন থাকলে কাটা ধানও নষ্ট হয়ে যাবে।
নেত্রকোণার ধনু নদীর পাশের খালিয়াজুড়ির কাদিরপুর হাওরে কৃষকরা জানান, শ্রমিক সংকটে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।যে হারে বজ্রপাত হচ্ছে, তার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। এ ফসলেই সারা বছর চলে। এখন যদি এগুলো নষ্ট হয়ে যায়, আর কিছু থাকবে না।
অনেক জমির বেশিরভাগ ধান এখন কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন থেকে চার দিন হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে হাওরের একমাত্র ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মৌলভীবাজারের মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নেত্রকোণার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াঝাঞ্জাইল পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি বইছে।
‘ভারী থেকে অতিভারী’ বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বেড়েছে। এ সময়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ এবং নেত্রকোণা-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী তিন দিন একই ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি আগামী তিন দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে এসব নদী ও উপনদীগুলো বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।
একইভাবে মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
সারিগোয়াইন-যাদুকাটা অববাহিকাতেও পানি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে যাদুকাটা নদী আগামী তিন দিনে বিপদসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সারিগোয়াইন নদী সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, নেত্রকোণার ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ভুগাই-কংস নদী আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সোমেশ্বরী নদী দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনে সতর্কসীমায় পৌঁছানোর পাশাপাশি কিছু পয়েন্টে বিপদসীমা ছাড়াতে পারে।
নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের ধনু-বাউলাই অববাহিকায়ও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অঞ্চলের নদীগুলো আগামী তিন দিনে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং বাউলাই নদীর কিছু পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা রয়েছে।
সার্বিকভাবে, টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৩-৪ তারিখ পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলসহ সারাদেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সিলেট অঞ্চলে ১-২ তারিখ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে জমির ধান পরিপক্ক হলেও কৃষকরা তা কাটতে পারছেন না। মাঠে থাকা ধানের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
দেশের অধিকাংশ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে, যার প্রায় ২০ শতাংশই আসে হাওরভুক্ত সাত জেলা থেকে।
ডিএই সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাত জেলায় এবার ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৫.০৮ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাউসী গ্রামের কৃষকরা জানান, হাওরের অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে ধান কেটে ঘরে তুলতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, খলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। অথচ ধানের দাম খুবই কম—এ অবস্থায় কৃষক পথে বসবে।
কৃষকরা জানান, বাজারে মিল মালিকেরা ৮০০ টাকা দরে ধান কিনছে। কিন্তু ধান কাটতে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ১০০০-১২০০ টাকা। পানি জমে থাকায় মাঠের অবস্থা খারাপ। প্রতি কিয়ার জমির ধান কাটতে অন্তত আটজন শ্রমিক লাগে। ফলন যদি কিয়ারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ মনও হয়, তবুও লোকসানই হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শতভাগ ধান কাটতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে কৃষক ও শ্রমিক কেউই ঠিকমতো মাঠে নামতে পারছেন না।
তবে বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক সরবরাহ করা হচ্ছে, পাশাপাশি হারভেস্টার দিয়েও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন।