হামের প্রাদুর্ভাবে মরছে শিশুরা, টিকায় ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

লেখক: Tapu Rayhan
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কমপক্ষে সাত জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চলতি মাসেই হামে ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। শিশুদের হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি আছে। হাম খুবই সংক্রামক, অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫–১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, ‘সারা দেশেই কমবেশি হাম আছে। তবে আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখতে পাচ্ছি।’

তবে সরকারের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও রোগী আছে।

সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোয় যোগাযোগ করে জানা গেছে, ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩টি, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৩টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত টিকাদান, শক্তিশালী নজরদারি, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সরেজমিনে হাসপাতাল

গতকাল দুপুরে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় ও লম্বা লাইন। অনেকের কোলে শিশু। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কেউ এসেছেন হাম কি না, তা নিশ্চিত হতে; কেউ এসেছেন বসন্ত কি না, তা জানতে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হাম, বসন্ত, এইচআইভি/এইডস, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর ও জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা হয়।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীর জন্য শয্যা আছে আটটি; কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে রোগী ভর্তি ছিল ১১৭ জন। বিভিন্ন তলায় বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়।

নরসিংদীর বাগহাটা গ্রাম থেকে আসা মুন্নি আখতারকে দেখা যায়, চারতলার বারান্দায় তাঁর এক বছরের ছেলে আহমদুল্লার জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। মুন্নি আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ দিন আগে ছেলের জ্বর হয়, পরে গায়ে র‍্যাশ ওঠে। স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ছেলেকে দেখান। তারপর ওই ক্লিনিক থেকে জানায় ছেলের হাম, এই হাসপাতালে আনতে পরামর্শ দেয়।

আরও পড়ুন  হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

রাজধানীর বছিলা এলাকা থেকে আসা এক নারী বলেন, এক বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো ওয়ার্ডে শয্যা পাননি।

হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু স্বাস্থ্য) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪৫০ জন রোগী হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল যে ১১৭ জন ভর্তি ছিল, তাদেরও ৭০ ভাগ হামের রোগী। চলতি মার্চে তিনটি শিশু মারা গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আজিমপুর থেকে বেশি রোগী আসছে। তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর টিকা নেওয়া নেই।

উল্লেখ্য, গত বছর ৬৯ জন হামের রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল।

হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান বলেন, কোনো রোগী না থাকায় কালাজ্বরের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। এইডসের কিছু রোগীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে তত্ত্বাবধায়ক জানান। তিনি বলেন, এখন বসন্ত রোগের মৌসুম। গতকাল ১০ জন বসন্তের রোগী ভর্তি ছিল। বসন্তের রোগী বাড়লে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হবে। বসন্ত রোগও সংক্রামক।

এই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক আছেন ২২ জন। হামের রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ছয়জন বাড়তি চিকিৎসক এই হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

রাজশাহী ও ময়মনসিংহের পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ জন সন্দেহজনক রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ৪৪ জন রোগী শনাক্ত হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে গতকাল বিকেলে ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল। পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিল ২৬ জন। এ বছর রাজশাহী মেডিকেলে ১২ জন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১১ দিনে ১০৫ জন হামের রোগী ভর্তি হয়। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ভর্তি ছিল ৬৯ জন। এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেলে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কেন এই প্রাদুর্ভাব

দাতা সংস্থাগুলোর একটি সূত্র বলছে, এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়। তবে টিকা কর্মসূচির কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। দেশে বেশ কয়েক বছর হাম ও রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইনও হয় না।

আরও পড়ুন  হামে গত ২৮ দিনে ১৬৯ শিশুর মৃত্যু

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ সালে। তখন ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে এই টিকা দেওয়ার কথা ছিল। তার আগে ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০১৪ সালে।

টিকাদান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) এক কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় গুদামে হাম–রুবেলার টিকার মজুত শূন্য। কোন জেলা বা কোন উপজেলায় টিকার মজুত ফুরিয়ে গেছে, তা তাঁর জানা নেই।

সরকারি একাধিক কর্মকর্তা ও একাধিক জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ বলেন, সব শিশু ঠিক সময়ে টিকা পাচ্ছে না। কিছু জায়গায় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী নেই। কিছু ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহ নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও হাম–রুবেলা নির্মূলবিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিসেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে টিকার সরবরাহের সংকট, কিছু ক্ষেত্রে জনবল স্বল্পতার কারণে শিশুরা টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

তবে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম হতে দেখা যাচ্ছে। অথচ টিকা দেওয়া হচ্ছে ৯ মাস ও ৯ মাসের পর থেকে। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগেই বিষয়টি লক্ষ করেছি। এর বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজা দরকার। বিষয়টি দেড় বছর আগে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’

এখন করণীয়

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাম সাধারণত শিশুদেরই হয়। প্রথমে জ্বর হয়। জ্বর তীব্র হতে থাকে। এরপর প্রথমে মুখমণ্ডলে র‍্যাশ উঠতে থাকে। তারপর তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের এ সময় নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালকে হাম রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। রাজধানীতে শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া হাম বেশি ছড়িয়েছে এমন এলাকাগুলোতে গণটিকাকরণের (মাস ক্যাম্পেইন) ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে গণটিকাকরণের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নেই।

  • টিকা
  • হাম