সংঘাতের বলি হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ ঘন্টা আগে

বোমাবর্ষণে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল থেকে শুরু করে পুড়ে যাওয়া তেলের ডিপোগুলো থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া-মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত প্রকৃতি ও জলবায়ুর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খবর এএফপি’র।

পরিবেশের ওপর যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। যুদ্ধের যে ক্ষতির খবর সাধারণত আড়ালেই থেকে যায়, তা এখানে তুলে ধরা হলো:

বোমারু বিমান ও যুদ্ধজাহাজ

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির বেঞ্জামিন নেইমার্ক জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে এবং ইরানে অভিযান চালাতে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমানগুলো বিপুল পরিমাণে জ্বালানি ব্যবহার করছে। দিনরাত স্টেলথ বোমারু বিমান এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা বিশ্বকে আরও উষ্ণ করে তুলছে।

নেইমার্ক এএফপি’কে বলেন, ‘মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিশাল বহর এখানে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে। এই বিশাল সৈন্যবাহিনীর খাবার, আবাসন এবং সার্বক্ষণিক কাজের জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। এসব ভাসমান শহর মূলত জ্বালানি শক্তির ওপর নির্ভরশীল।’

অধিকাংশ বড় বিমানবাহী রণতরী পারমাণবিক শক্তিতে চললেও, অন্যগুলোতে দূষণকারী ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের পরিবেশগত প্রভাব নির্ণয় করতে অস্ত্র তৈরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পর্যন্ত সবকিছুই বিবেচনায় নেন।

‘ওয়ান আর্থ’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, গাজা সংঘাত থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়েছে। এটি ৭৬ লাখ পেট্রোলচালিত গাড়ির নির্গত ধোঁয়া অথবা জর্ডানের মতো একটি ছোট দেশের বার্ষিক নির্গমনের সমান।

অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কার্বন নির্গত হয়েছে ৩০ কোটি টনেরও বেশি, যা ফ্রান্সের বার্ষিক নির্গমনের সমান। ‘ইনিশিয়েটিভ অন জিএইচজি অ্যাকাউন্টিং অফ ওয়ার’-এর এই হিসাবে সামরিক অভিযান, পুনর্গঠন কাজ, বন-দাবানল এবং বিমানের দীর্ঘ পথ ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জলবায়ু ঝুঁকি

এই যুদ্ধ মূলত হরমুজ প্রণালীতে চলছে, যা বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান পথ।

আরও পড়ুন  গাজায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীতে সেনা পাঠাচ্ছে ৫ দেশ

নেইমার্ক বলেন, এই সরু পথ দিয়ে যাতায়াতকারী অত্যন্ত দাহ্য জ্বালানিভর্তি জাহাজ, অঞ্চলটির তেল ও গ্যাস শোধনাগার এবং মজুত কেন্দ্রগুলো এখন যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এবারের সংঘাত ভিন্ন ধরনের। আমরা ইতোমধ্যেই অনেকগুলো শোধনাগারে হামলার ঘটনা দেখেছি। এসব স্থাপনা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং জলবায়ুর জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।’

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশকে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েতের তেলকূপগুলোতে দেওয়া আগুন নেভাতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। তখন ১৩ থেকে ৪০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছিল।

সুদূরপ্রসারী প্রভাব

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝোঁকার প্রবণতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ইন্সটিটিউট ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস-এর আন্দ্রেয়াস রুডিঙ্গার বলেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবে নীতিনির্ধারকরা এখন জলবায়ু রক্ষার চেয়ে দাম কমানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ব্রাসেলসকে তাদের নির্গমন নীতি শিথিল করার জন্য চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক দেশ জনগণকে সস্তায় জ্বালানি তেল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তবে রুডিঙ্গার একটি ইতিবাচক দিকও দেখছেন। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, জীবাশ্ম জ্বালানির দাম বাড়লে মানুষ বিদ্যুৎ বা অন্য বিকল্প ব্যবস্থার দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। যেমন ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে জ্বালানির দাম বাড়ায় হিট পাম্পের জনপ্রিয়তা বেড়েছিল।’

দূষণ ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো, তেলবাহী জাহাজ এবং সামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে আশেপাশের বাতাস ও পানি দূষিত হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক।

গত সপ্তাহে তেহরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় পুরো রাজধানী।

ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনস (আইআরআইএস)-এর মাথিল্ড জর্দে বলেন, পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে বাতাস, পানি ও মাটি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন  ‘ব্যানার চুরি ঠেকাতে’ সিসিটিভি!

কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি (সিইওবিএস)-এর পরিচালক ডগ উইয়ার এএফপি’কে বলেন, ‘আমরা কেবল সমস্যার উপরিভাগ দেখতে পাচ্ছি। ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে শত শত ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের সংবেদনশীল সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’