ভূখণ্ড ছাড়তে হলেও যুদ্ধের অবসান চান ইউক্রেনের মানুষ !

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ মাস আগে

পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন গড়েছিলেন ক্রিস্টিনা ইয়ারচেনকো। সেখানে নিজের মালিকানাধীন একটি জনপ্রিয় নাচের স্টুডিও গড়ে তুলতে তিনি সবটুকু শক্তি ও সময় ব্যয় করেছিলেন। তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজনে এসব কিছু ছেড়ে দিতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। ইয়ারচেনকো সেই ইউক্রেনীয়দের একজন, যারা মনে করছেন যুদ্ধ থামাতে হলে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা দনবাসের কিছু অংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

যুদ্ধক্লান্ত ইউক্রেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই মনোভাব একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া যেসব এলাকা দখল করতে পারেনি, সেগুলো ছেড়ে দেওয়াকে একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখা হতো। তবে একসময় যা অসম্ভব মনে হয়েছিল, তা এখন আর তেমন মনে হচ্ছে না। কারণ ক্রেমলিন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেন যদি দনবাস থেকে সরে যেতে রাজি হয়, তবেই মার্কিন-সমর্থিত শান্তি আলোচনা এগোতে পারে।

ইয়ারচেনকো বলেন, ‘আমার কাছে শান্তিটাই অগ্রাধিকার। দনবাস ছেড়ে দেওয়ার পর যদি নিশ্চিতভাবে আর যুদ্ধ না হয়, তবে আমি চলে যেতে প্রস্তুত।’ তবে তিনি জানান, ইউক্রেনের মিত্ররা যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তার বিষয়ে জোরালো নিশ্চয়তা দিলে তবেই তিনি ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার পক্ষে থাকবেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে গত বুধবার ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলার সময় ডনবাসের ভবিষ্যৎ অন্যতম জটিল ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।

দনবাসের শহরগুলো সুরক্ষিত রাখতে ইউক্রেন বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে এবং এই শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলটি রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। দোনেৎস্ক ও লুহানৎস্কসহ একাধিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই ভূখণ্ডের দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রায় ২০ শতাংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও লুহানৎস্কের পুরো এলাকাই হারিয়েছে দেশটি।

দনবাস দখল করতে পারলে রাশিয়ার পক্ষে অন্তত একটি বিজয়ের দাবি তোলা সম্ভব হতে পারে। যদিও পুরো ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্য থেকে তারা এখনও অনেক দূরে রয়েছে। একই সঙ্গে দনবাসে ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়ার সেনা হতাহতের সংখ্যাও বেশি।

প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দনবাস থেকে একতরফাভাবে সরে আসার বিরোধিতা করেছেন। তবে তিনি মাঝেমধ্যে নমনীয়তার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্র ও আলোচনার টেবিল—উভয় জায়গায় চাপ বাড়তে থাকায় রাশিয়া ও ইউক্রেন দু’পক্ষকেই আপসের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আরও পড়ুন  পাকিস্তানে সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ২২

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর দুই বছর পর দেশটির জনগণের একটি অংশের মধ্যে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিষয়ে মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক এক জরিপে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইউক্রেনীয়। তবে এ বিষয়ে এখনো দেশজুড়ে ব্যাপক দ্বিমত রয়েছে।

২০২২ সালের মে মাসে কিয়েভের আশপাশ থেকে রুশ সেনাদের পিছু হটাতে সক্ষম হওয়ার পর কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সোসিওলজির এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, ৮২ শতাংশ ইউক্রেনীয় কোনো পরিস্থিতিতেই দেশের ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন।

সোমবার প্রকাশিত ওই সংস্থার সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে দনবাস ছেড়ে দেওয়াকে সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এই দুটি জরিপ সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়, কারণ আগের জরিপে নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

তবুও অধিকাংশ ইউক্রেনীয় এখনো ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে। অনেকে জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা আরও কষ্ট সহ্য করতেও প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, দনবাস ছাড় দেওয়া হলে ইউক্রেনীয় সমাজে বিভাজন তৈরি হতে পারে এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিলিফ কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের প্রধান ইয়েভহেন কলিয়াদা বলেন, ‘জনাব জেলেনস্কি তার জনগণের কথা শোনেন এবং তিনি এটা করবেন না।’

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওলেহ সাকিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, দনবাস ছেড়ে দিলেও তাতে স্থায়ী শান্তি আসবে—এমন ধারণা ভুল।

ধারণা করা হচ্ছে, নাচের স্টুডিওর মালিক ইয়ারচেনকোর মতো অনেকেই রুশ শাসনের অধীনে থাকার চেয়ে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে চলে যেতে পারেন।

রিলিফ কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের প্রধান ইয়েভহেন কলিয়াদা বলেন, ‘জেলেনস্কি তাঁর জনগণের কথা শোনেন এবং তিনি এটা করবেন না।’ দনবাসসহ সম্মুখ রণাঙ্গনের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে এই সংস্থাটি সহায়তা করেছে।

কিয়েভের স্বাধীন সংস্থা ‘নিউ জিওপলিটিক্স রিসার্চ নেটওয়ার্ক’-এর পরিচালক মাইখাইলো সামুস বলেন, ইউক্রেনীয় আইনে এমন কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই, যা সামরিক শক্তির মাধ্যমে দখল করা হয়নি।

জেলেনস্কি প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি সেনামুক্ত অঞ্চল গড়ে তুলতে ইউক্রেনীয় ও রুশ সেনারা ডনবাসের সম্মুখ রণাঙ্গন থেকে সমান দূরত্বে সরে যাক। সামুস বলেন, তাত্ত্বিকভাবে এমন আপস বিবেচনা করা গেলেও বাস্তবে পুতিন সামরিক পথই বেছে নিয়েছেন এবং শক্তি প্রয়োগ কিংবা আলোচনার মাধ্যমে ওই অঞ্চল দখলের অঙ্গীকার করেছেন।

আরও পড়ুন  চার মাস পেট্রল রপ্তানি বন্ধ রাখতে যাচ্ছে রাশিয়া

বিশ্লেষকদের মতে, যারা দনবাস ছাড় দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের আশঙ্কা, এমন নিশ্চয়তা ছাড়া ইউক্রেন যদি সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়, তবে রাশিয়াকে থামানো কঠিন হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে রাশিয়া শক্তি সঞ্চয় করে ওই অঞ্চল ব্যবহার করে ডনবাসের সুরক্ষিত শহরগুলোর বাইরের খোলা সমতল ভূমিতে নতুন করে হামলা চালাতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং থিংক ট্যাংক ‘ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সোশ্যাল কোহেশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওলেহ সাকিয়ান বলেন, ইউক্রেনীয়দের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাসের অর্থ হতে হবে ‘এমন এক নিশ্চয়তা, যেখানে নতুন করে আর কোনো হামলা হবে না এবং অংশীদার দেশগুলো তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে।’

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিষয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে প্রস্তুত। ইউরোপীয় দেশগুলো যেকোনো যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ইউক্রেনকে রক্ষায় তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে, ইউক্রেনের ভেতরে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে রাশিয়া।

সাকিয়ান সতর্ক করে বলেন, দনবাস ছেড়ে দেওয়া হলেও তাতে রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে সরানো যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে কোনো সীমারেখা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছালে তা সাময়িক শান্তি বয়ে আনবে—এমনটা ভাবা বিশাল এক ভুল ধারণা।’

যা-ই ঘটুক, ইয়ারচেনকো বলেছেন, শান্তিই তার প্রধান লক্ষ্য। তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিশাল ভূখণ্ড ছেড়ে দিলেও রাশিয়া যে আবার আক্রমণ করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যদি দনবাস ছেড়ে দেয়, তবে আমাদের সরে যেতে হবে এবং শূন্য থেকে জীবন শুরু করতে হবে। যুদ্ধ শেষ করার জন্য এটি একটি কঠিন কিন্তু যৌক্তিক ত্যাগ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু কে নিশ্চয়তা দেবে যে আমাকে আবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না?

  • ইউক্রেন
  • দনবাস
  • রাশিয়া