ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) । সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এবং ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত এই তরুণ নেতার মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শরিফ ওসমান হাদি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন, যার মুখপাত্র হিসেবে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তার সোচ্চার বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তাকে আলোচিত-সমালোচিত করে তুলেছিল।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে গণসংযোগ করছিলেন তিনি। হঠাৎ চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা তার মাথায় গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সঙ্গে ছিলেন তার ভাইয়েরা এবং বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্সরা। এরপর সিঙ্গাপুরে তার মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করা হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
হামলার ঘটনায় পুলিশ ও র্যাব তদন্ত করে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানকে। সহযোগী হিসেবে আলমগীর শেখের নাম উঠে আসে, যিনি মোটরসাইকেল চালক ছিলেন। তদন্তে জানা যায়, ফয়সাল নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। হামলার পর তারা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান বলে সূত্র জানায়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা মোসা. হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভিন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, বান্ধবী মারিয়া আক্তার, সহযোগী মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, মো. কবির, আব্দুল হান্নান, মো. হিরন, মো. রাজ্জাক এবং সীমান্তে মানব পাচারকারী সিমিরন দিও ও সঞ্জয় চিসিম রয়েছেন।

হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও অস্ত্রের সূত্রও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
হাদির মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এ হামলাকে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আঘাত বলে অভিহিত করেন এবং দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে শোক জানিয়েছেন।
এদিকে জুলাইয়ের এই যোদ্ধার লড়াই থেমে গেলেও তার আদর্শ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে—এমনটাই বলছেন তার সহযোদ্ধারা।