জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সানরিকু উপকূলীয় অঞ্চলে ৮ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা বলেছে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জেএমএ (জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সি)। স্থানীয় সময় গত সোমবার রাতে আওমোরি প্রদেশের কাছে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরপরই জেএমএ’র কর্মকর্তারা উত্তর ও পূর্ব জাপানের জনগণকে সম্ভাব্য শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। টেকটনিক প্লেটের নতুন অস্থিরতার কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলে ‘মেগাকোয়েক’ এর ঝুঁকি ০.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ শতাংশ হয়েছে।
আওমোরি জেলার পূর্ব উপকূলে স্থানীয় সময় গত সোমবার রাত ১টা ১৫ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে, যার ফলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
জাপানের সংবাদমাধ্যম এনএইচকে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনে হাচিনোহে শহরের বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।মুৎসু শহরের একটি হোটেলের সাইনবোর্ড পার্কিং লটে থাকা একটি গাড়ির উপরে পড়ে যায়। আর আওমোরি শহরের একটি বাড়িতে আগুন লেগে যায়। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হোক্কাইদো, আওমোরি এবং ইওয়াতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যান।
হাচিনোহে শহরের একজন আশ্রয়গ্রহণকারী এনএইচকেকে বলেছেন, “২০১১ সালে ভূমিকম্প ও ৎসুনামি আঘাত হানার পর আমি এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। উঁচু কোনও জায়গায়, আমার বাড়ির চেয়ে উঁচুতে কোথাও এলে আমি নিরাপদ বোধ করি।”
জেএমএ সতর্ক করে বলেছে, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা হোক্কাইদো থেকে চিবা পর্যন্ত জনগণকে আগামী এক সপ্তাহের জন্য সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ২০১১ সালের ভূমিকম্পের মতোই হবে। তাই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এমন শক্তিশালী কম্পনের পর আরও বড় ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে। আমরা সকলে নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।”
জাপানের ভূগর্ভস্থ অবস্থান এবং রিং অফ ফায়ারে অবস্থিতির কারণে দেশটি বছরে ১ লাখেরও বেশি ভূমিকম্পের শিকার হয়, যার অধিকাংশ ছোট। কিন্তু ৮ মাত্রার ‘মেগাকোয়েক’ একটি ভয়াবহ ঘটনা, যা সাবডাকশন জোনের প্লেট স্লিপের ফলে ঘটে। জাপানের হেডকোয়ার্টার্স ফর আর্থকোয়েক রিসার্চ প্রমোশন অনুসারে, এমন ভূমিকম্প জাপান ট্রেঞ্চ এবং চিশিমা ট্রেঞ্চে ঘটতে পারে, যা ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার তোহোকু ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সেই ভূমিকম্পে ২ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ফুকুশিমা বিপর্যয় ঘটেছে। ক্যাবিনেট অফিসের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এমন মেগাকোয়েকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং জিডিপির অর্ধেকের সমান ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
এই সতর্কতা ২০২২ সালে চালু হওয়া সিস্টেমের প্রথম ব্যবহার। জেএমএ-র পরিচালক সাতোশি হারাদা বলেন, “এটি একটি সতর্কবার্তা, ভবিষ্যদ্বাণী নয়। কিন্তু ১৮২টি মিউনিসিপ্যালিটিতে বাসিন্দাদের জরুরি প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যোশিহিরো হিরামাতসু বলছেন, সোমবারের কম্পন মাটির ভারসাম্য নষ্ট করে বড় ভূমিকম্পের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
জাপান সরকার একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে, এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষরা স্কুল, হাসপাতাল এবং অবকাঠামো পরিদর্শন শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের সেরা বলে পরিচিত। বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দিচ্ছেন: জরুরি কিট প্রস্তুত রাখুন, উচ্চভূমিতে যান এবং অ্যাপের মাধ্যমে সতর্কতা অনুসরণ করুন।