এন্ডোসালফান: সবুজ কেরালার কালো অধ্যায়

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

কেরালা, ভারতের সবুজতম রাজ্য, যেনো প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক অপরূপ চিত্রকলা। নারকেল গাছের সারি, সবুজ ধানের খেত, পাহাড়ি ঢালে ছড়িয়ে থাকা কাজু বাগান, আর পশ্চিমঘাটের ঘন জঙ্গল। এখানকার মানুষের সাক্ষরতার হার, স্বাস্থ্যসেবা ও মানব উন্নয়ন সূচক ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু এই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কালো অধ্যায়, ‘এন্ডোসালফান’।

সস্তা অথচ শক্তিশালী কীটনাশক এন্ডোসালফান কেরালার কাসারগোড় জেলার হাজারো পরিবারের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে আকাশ থেকে ছিটানো এই বিষাক্ত রাসায়নিক আজও হাজারো মানুষের শরীরে যেমন আছে তেমনি এর ভয়াবহতার ইতিহাস জ্বলজ্বল করছে হাজারো মায়ের চোখের জলে। 

১৯৬০-এর দশকে কেরালা সরকারের কৃষি বিভাগ কাসারগোড়ে প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে কাজু বাগান গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ১৯৭৮ সালে এই বাগানগুলো কেরালা প্ল্যান্টেশন কর্পোরেশন (পিসিকে) এর হাতে চলে যায়। তারা ‘টি মসকিউটো বাগ’ নামের এক ধরনের পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে প্রথমে হ্যান্ডপাম্পে কীটনাশক স্প্রে শুরু করে। কিন্তু খরচ কমাতে ও ফলন বাড়াতে ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকে শুরু হয় আকাশ থেকে স্প্রে করা। প্রতি বছর ২-৩ বার হেলিকপ্টার থেকে ছড়ানো হতো এন্ডোসালফান নামের এই অর্গানোক্লোরিন কীটনাশক।

শুধু কাজু নয়, পরে চা, ধান, আমসহ অন্য ফসলেও এর ব্যপক ব্যবহার শুরু হয়। কাসারগোড়ের ১১টি পঞ্চায়েতের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর এলাকাও আসে এই বিষের সংস্পর্শে। বিশেষ করে দরিদ্র শ্রমিক ও আদিবাসী পরিবার—এই বিষের সংস্পর্শে আসে ভয়াবহভাবে।

এই বিষের বিষাক্ত প্রভাবের বিষয়ে প্রথম সতর্কবার্তা আসে ১৯৭৯-৮১ সালে। স্থানীয় সাংবাদিক শ্রী পাদ্রে লিখতে শুরু করেন। তার লেখার প্রকাশিত হতে থাকে বিষের প্রভাবে গরু-ছাগলের বাচ্চার বিকৃত অঙ্গধারী হওয়ার কথা, নদীতে মাছ মরে ভেসে উঠার খবর, মৌমাছি, ব্যাঙ, সাপ হারিয়ে যাওয়ার চিত্র। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কানে তা পৌঁছায়নি।

আরও পড়ুন  কঙ্গোতে মিলিশিয়া বাহিনীর হামলায় নিহত ৬৯

তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে মানুষের শরীরে, নতুন জন্ম নেওয়া মানব মিশুর শরীরে। শিশুরা জন্ম নিতে শুরু করে সেরিব্রাল পালসি, মৃগীরোগ, হাইড্রোসেফালাস (মাথায় পানি জমে ফুলে ওঠা), শারীরিক বিকৃতি, মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। অনেকের চামড়ায় র‍্যাশ, হরমোনের সমস্যা, হাঁপানি, ক্যান্সার দেখা দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব, স্নায়বিক সমস্যা বাড়ে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ও কেরালা সরকার এসবের জন্য এন্ডোসালফানকে দায়ী করে। যদিও কিছু বিজ্ঞানী বলেন, এলাকায় অন্যান্য কীটনাশকও ব্যবহৃত হতো, তাই এককভাবে দোষারোপ করা ঠিক নয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় রক্ত, দুধ, মাটি ও পানিতে এন্ডোসালফানের অবশিষ্ট পাওয়া যায়।

একটি পরিবারের কথা ভাবুন। বাবা-মা দিনমজুর। দুপুরে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনে বাচ্চারা ছুটে দেখতে যায়—যেন আকাশ থেকে সাদা মেঘ নামছে। কয়েক বছর পর সেই বাচ্চা জন্মায় অসুস্থ হয়ে। মা-বাবা দিনরাত তার সেবা করেন, কিন্তু চিকিৎসার খরচে সংসার শেষ। অনেক বাড়িতে দুই-তিনটি শিশু একই সমস্যা নিয়ে জন্ম নিয়েছে।

মধুরাজ দুই দশক ধরে এই পরিবারগুলোর কাছে গিয়েছেন। তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ফোলা মাথার শিশু, হাত-পা বাঁকা হয়ে যাওয়া শরীর, মায়ের কোলে অসহায় দৃষ্টি। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি কীভাবে একটি কীটনাশক পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কেরালার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনেক এগিয়ে, কিন্তু এই ভুক্তভোগীদের প্রতি ন্যায়বিচার হয়নি।’

১৯৯০-এর শেষভাগ থেকে শুরু হয় প্রতিবাদ। আক্রান্ত শিশুদের মা-বাবা, পরিবেশকর্মী, নাগরিক সমাজ রাস্তায় নামে। ২০০১ সালে সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টরিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০০৪ সালে কেরালা পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড স্প্রে বন্ধ করে। ২০১১ সালে স্টকহোম কনভেনশন বিশ্বব্যাপী এন্ডোসালফান নিষিদ্ধ করে। একই বছর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট কেরালা সরকারকে প্রায় ৫ হাজার ভুক্তভোগীকে ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু বাস্তবে মিলেছে বিলম্ব ও অসম্পূর্ণতা। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট সরকারের বিলম্বের সমালোচনা করে। ২০২৫-২০২৬ সালেও ক্ষতিপূরণের লড়াই চলছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসেও সরকার ৯৭৭ জনকে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার অনুমোদন দেয়। ওই তালিকায় আরো ১ হাজার ৩১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। ‘স্নেহাগ্রামম’ প্রকল্পে পুনর্বাসনের কাজ চলছে, কিন্তু এখনও অনেকের সময় কাটছে আক্ষেপ আর অপেক্ষায়।

আরও পড়ুন  ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন মুজতবা খামেনি; দিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

এন্ডোসালফানের বিষ শুধু শরীরে নয়, মনে-সমাজেও ছড়িয়েছে। অনেক মা-বাবা অসুস্থ সন্তানের বোঝা নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ২০২২ সালে ভিমলা নামের এক মা তার ২৮ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েকে গলা টিপে মেরে নিজেও আত্মহত্যা করেন।

দরিদ্রতা, পুষ্টির অভাব, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা সমস্যা আরও গভীর করেছে। এখনও কাসারগোড়ের অনেক গ্রামে এই অভিশাপের ছায়া। মাটি-পানিতে অবশিষ্ট থাকতে পারে সেই বিষের প্রভাব।

অবশ্য ২০২৫ সালে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল পিসিকেকে ব্যারেল উদ্ধার ও পরিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এন্ডোসালফান ট্র্যাজেডি শুধু কেরালার নয়, পুরো দেশ ও বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা। সবুজ বিপ্লবের নামে অন্ধভাবে রাসায়নিক নির্ভরতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার উদাহরণ। এই ক্ষত ভোলা উচিত নয়। সরকার, সমাজ ও নাগরিকদের দায়িত্ব এই ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো, পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা করা ।

তাদের ভাষ্য, সবুজ কেরালার এই কালো অধ্যায় শেষ হোক ন্যায়বিচারে। যেন ভবিষ্যত প্রজন্ম শুধু সবুজ দেখে, বিষের বৃষ্টি নয়।

  • এন্ডোসালফান
  • কেরালা
  • ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি