কী হবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের?

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ ঘন্টা আগে

দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই ও নিরাপদ সুরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণের গতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চালুর পর প্রথম ১০ মাসে যেখানে তিন লাখের বেশি মানুষ এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেখানে সর্বশেষ ২০ মাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন মাত্র ৩৮ হাজার ৩৪ জন মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে মাসে গড়ে ১৫০ জনের মতো নতুন নিবন্ধন হচ্ছে বলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নাগরিকদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি চালু করে। তখন সরকার বলেছিল, সরকারি চাকরির বাইরে থাকা নাগরিকদের জন্য টেকসই সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩১ জন নিবন্ধন করেছিলেন। ওই সময় পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীরা মোট ৯৯.৪২ কোটি টাকা জমা দেন। চালুর মাত্র ১০ মাসেই নিবন্ধন তিন লাখ ছাড়িয়ে যাওয়াকে তখন কর্মসূচির বড় সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

তবে পরে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মোট নিবন্ধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৬৫ জনে। এই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন স্কিমে জমা হয়েছে প্রায় ২৪২ কোটি টাকা।

এ বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৪০ জন এই কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেন। ফেব্রুয়ারি মাসে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১৪৮ জন। এদিকে জানুয়ারি মাসে নিবন্ধনকারীরা ৫.৯০ লাখ টাকা জমা করেছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে জমা হয়েছে ৩.২১ লাখ টাকা।

কর্মকর্তারা বলছেন, সচেতনতার ঘাটতি এবং মানুষের আস্থার সংকট অংশগ্রহণ কমার অন্যতম কারণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রচারণা কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় নতুন নিবন্ধন কমেছে। অনেক নাগরিক এখনো স্কিমের সুবিধা, রিটার্ন ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন।

আরও পড়ুন  যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪ মাসে ৬৭৫ বাংলাদেশি বহিষ্কার

সবচেয়ে বেশি আগ্রহ সমতা স্কিমে

নিবন্ধনকারীদের বড় অংশ যুক্ত হয়েছেন নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য চালু করা সমতা স্কিমে। মোট নিবন্ধনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এই স্কিমে। 

স্কিমটিতে একজন সদস্য মাসে ৫০০ টাকা জমা দিলে সরকার সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে মোট ১ হাজার টাকা জমা হয়। সমতা স্কিমে নিবন্ধন প্রায় পৌনে ৩ লাখে পৌঁছেছে। 

অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু করা প্রবাস, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রগতি ও স্বনিয়োজিতদের জন্য সুরক্ষা স্কিমে অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।

বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের জন্য চালু করা প্রগতি স্কিমে নিবন্ধনকারী ব্যক্তিগতভাবে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দিতে পারেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এই অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যেখানে কর্মী ও নিয়োগকর্তা সমানভাবে জমার অর্থ বহন করে থাকেন। তবে এই স্কিমে নিবন্ধনের হার তুলনামূলকভাবে কম।

একইভাবে কৃষক, শ্রমিক ও রিকশাচালকসহ স্বনিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য চালু করা সুরক্ষা স্কিমে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, এ স্কিম তুলনামূলকভাবে খুব কম মানুষকেই আকৃষ্ট করতে পেরেছে।

নিবন্ধন কমার কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন পেনশন স্কিম দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে। 

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-এর (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলে কর্মজীবনে সামান্য সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল আয়ের নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভব হয়, যা দারিদ্র্য কমানো, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সচেতনতা ও স্পষ্ট ধারণার অভাব, আস্থার সংকট ও অনিয়মিত আয়ের মতো কারণে পেনশন স্কিমে নিবন্ধন কমে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজ নিবন্ধন পদ্ধতি ও মানুষের আস্থা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন সেলিম রায়হান।

আরও পড়ুন  বেলুচিস্তানে ৯২ স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে পাকিস্তান

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের আস্থার অভাবের কারণে এই কর্মসূচি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না।

তবে ফাহমিদা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি প্রয়োজনীয়। কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষ পেনশন ব্যবস্থার বাইরে থাকে এবং এর ফলে বৃদ্ধ বয়সে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। তিনি আরও বলেন, সার্বজনীন পেনশন স্ক্রিম সবার কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারকে আস্থা তৈরি করতে হবে।

অংশগ্রহণ বাড়াতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে চুক্তি করেছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নিবন্ধন সহজ করার উদ্যোগও নিয়েছে। এছাড়া দেশব্যাপী পেনশন মেলা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। 

সূত্র: টিবিএস বাংলা