উত্তরের জেলাগুলোতে আলুর দামে ধস নামার মধ্যেই অকাল বৃষ্টিতে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে আলুখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানিতে খেত তলিয়ে যাওয়ায় আলুতে পচন ধরার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। দরপতনের হাহাকারের মাঝেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আলুচাষিরা।
গত বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হওয়া বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জ, আমাশু কুকরুল, সদরের পালিচড়া ও পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর, ছাওলা, অন্নদানগর ও কান্দি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ আলুখেত পানিতে তলিয়ে আছে। ফসল রক্ষায় খেত থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করছি, ফলনও ভালো হইছে। কিন্তু হঠাৎ করে ঝড়বৃষ্টিতে আলুর অনেক ক্ষতি হইল। সকালে এসে দেখি আলুখেতে অনেক পানি জমে গেছে। এখন পানি কমানোর চেষ্টা করতেছি।’
তিনি বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম নাই, কেজি মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা। এখন বৃষ্টির কারণে কেজিপ্রতি আরও দুই টাকা কমে যাবে। এ অবস্থায় মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেল এই বৃষ্টি।’
আলুচাষি এমদাদুল হক বাবু বলেন, সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারদেনা করে আলু চাষ করে এখন বিপাকে আছি। বাজারে দাম নেই। কোল্ড স্টোরে রাখতে হলে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে। না হয় কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছে অল্প দামে আলু বিক্রি করতে হবে। এ কারণে খেতের মধ্যেই আলু রেখেছিলাম। দাম ভালো মিললে বিক্রি করব। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল।
এমদাদুলের মতে, শুধু তিনি নন, গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ আলুচাষিই এই অকাল বৃষ্টিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নগরীর আমাশু কুকরুল এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, গত কয়েক বছর আলু চাষ করে তাদের অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন। এবার ফলন ভালো হলেও বৃষ্টিতে হতাশ তারা।
কৃষক মোহাম্মদ আরিফ জানান, তার জমিতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু একদিকে বাজারে আলুর দাম কম, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃষ্টি। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের মতো এবারও আলুতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
আরেক কৃষক জানান, গত বছর লাভের আশায় কিছু আলু হিমাগারে রেখেছিলেন, কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই আলু আর তুলতে পারেননি। এমন হতাশা রংপুরের বহু আলুচাষির মধ্যেই রয়েছে। কৃষকদের এই দুর্দিনে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকার ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তা কামনা করেছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন। এর মধ্যে রংপুর জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে, যা গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ কমেছে।
বিভাগে ১১৬টি হিমাগারে সর্বোচ্চ ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ সংকট ও বাজারদরের পতনের কারণে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতেই এবার প্রায় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিভাগে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং পচে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। খেত থেকে পানি সরিয়ে যেকোনোভাবে আলু রক্ষার জন্য চাষিদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি।’
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ দিন থেমে থেমে এমন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, আলুর বাজারদর অনেক জায়গায় কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকায় নেমে এসেছে। একইসঙ্গে বোরো আবাদে প্রয়োজনীয় সারের সংকট এবং দামও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আলু আমাদের প্রধান সবজি ও অর্থকরী ফসল। বিশ্বব্যাপী আলুর চাহিদা ব্যাপক। অথচ দেশের বাজারে আলু চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এমন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে আলু নিয়ে চাষিরা আরও বেশি চিন্তিত।’
আলুর লাভজনক দাম নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও কালোবাজারি বন্ধ করা এবং প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র: ইউএনবি নিউজ