জাহাজ ভাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্টতা: হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের তেল পরিবহনে জটিলতা

লেখক: Tapu Rayhan
প্রকাশ: ২ দিন আগে

প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে বাংলাদেশগামী একটি ট্যাংকার গত সাত দিন ধরে সৌদি আরবের রাস তানুকা বন্দরে আটকা পড়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারছে না।

সৌদি আরব থেকে তেল নিয়ে যাত্রা শুরুর কথা থাকলেও নরডিক পোলাক্স নামের জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নরভিক এনার্জির মাধ্যমে ভাড়া করার কারণে এখনো গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়নি। এই অঞ্চলে মার্কিন বাণিজ্যিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন জাহাজগুলোর ওপর সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। 

একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভাড়া করা আরেক ট্যাংকার ওমেরা গ্যালাক্সি নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল ধানা বন্দর থেকে আরও ১ লাখ টন ক্রুড তেল নেওয়ার কথা ছিল সেটির। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজটির মালিকপক্ষ জাহাজ পাঠাতে চাইছে না। 

এমনকি বাংলাদেশের মালিকানাধীন জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রাও হরমুজ প্রণালি পার হতে পারছে না। জেবেল আলি বন্দর থেকে জ্বালানি-বহির্ভূত পণ্য নিতে কুয়েত যাওয়ার কথা ছিল জাহাজটির।

দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তৎপরতা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) প্রতি মাসে সাধারণত ১ থেকে ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই তেল পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে থাকে। 

তেল পরিবহনের জন্য শিপিং কর্পোরেশন মূলত নরভিক এনার্জির জাহাজই ব্যবহার করে। সর্বশেষ চালানের তেল ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছেছে। বর্তমান ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মাসে দুটি ট্যাংকারে করে তেল আসার কথা ছিল।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সমুদ্র-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি এখন বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর রুট। 

তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এই প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা পেলেও মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা জাহাজগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে।’

আরও পড়ুন  হাদির অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন, মস্তিষ্কে অপারেশনের অপেক্ষায় ডাক্তাররা

পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও আরব সাগরকে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। বিশ্বের মোট তেলের চালানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ এলএনজি ও এলপিজিও এই রুট দিয়েই পরিবহন করা হয়। 

সৌদি উপকূলে দাঁড়িয়ে আছে নরডিক পোলাক্স

রাস তানুকা বন্দর থেকে তেল বোঝাই করার পর গত ৩ মার্চ থেকে সেখানেই নোঙর করে দাঁড়িয়ে আছে নরডিক পোলাক্স। চলমান যুদ্ধে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণেই এই স্থবিরতা। 

জাহাজটির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই বিপিএসি ও কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে শিপিং কর্পোরেশন।

শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক চিঠিতে বলেছেন, ১-২ মার্চের সময়সূচি অনুযায়ী ১ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুট তেল পরিবহনের জন্য জাহাজটি ভাড়া করা হয়েছিল। 

জাহাজটি ১ মার্চ বন্দরে পৌঁছে ৩ মার্চের মধ্যে তেল বোঝাইয়ের কাজ শেষ করে। 

চট্টগ্রামের উদ্দেসে যাত্রা শুরুর আগে ৪ মার্চ থেকে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতির অপেক্ষায় ওই বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। 

বিলম্বিত হতে পারে ওমেরা গ্যালাক্সির যাত্রা

দ্বিতীয় ট্যাংকার ওমেরা গ্যালাক্সির আগামী ২০-২১ মার্চের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল ধানা থেকে আরও ১ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড নেওয়ার কথা ছিল। 

কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজটির মালিকপক্ষ সেখানে জাহাজ পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেছে। জাহাজ ভাড়া দেওয়া সংস্থা নরভিক এনার্জির পক্ষ থেকে ১০ দিনের বিলম্বের অনুরোধ করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা এখন বিকল্প হিসেবে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে তেল নেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। তবে সেখানে জাহাজের বার্থ পাওয়া, সরবরাহ লজিস্টিকস ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের বিষয়গুলোও চিন্তায় রাখছেন তারা।

আরও একটি জাহাজ বিলম্বের মুখে

শিপিং কর্পোরেশন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি-সংলগ্ন এলাকায় বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে তাদের জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা সাধারণ পণ্য বোঝাই করতে কুয়েতে যেতে পারছে না।

আরও পড়ুন  হাদি হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে: উপদেষ্টা আসিফ নজরুল

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে কর্পোরেশন জানিয়েছে, গত ১১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দর থেকে কুয়েতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল জাহাজটির। কিন্তু চলমান যুদ্ধে শেষ মুহূর্তে কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, জাহাজটির কুয়েত থেকে হামান বন্দরে পণ্য নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। জাহাজ ভাড়া চূড়ান্ত হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি যাত্রা করছে না। জাহাজটি এখন বন্দরের কাছাকাছি একটা নিরাপদ এলাকায় নোঙর করে আছে।

তিনি আরও বলেন, জাহাজটির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক চ্যানেলে তৎপরতা চলছে। শিপিং কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিপিসিসহ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। 

মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত এই রুটে জাহাজ পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’

আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা

জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশের একমাত্র শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পুরোপুরি আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ওপর ভিত্তি করে চলে।

বিপিসির তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

মোট চাহিদার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল হিসেবে আমদানি করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। শোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের সব চালানই বিদেশি শিপিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পরিবহন করে শিপিং কর্পোরেশন।

সাধারণত বড় জাহাজগুলো চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে পৌঁছনোর পর ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে সেই তেল শোধনাগারে পৌঁছনো হয়। 

বর্তমান অবস্থা নিয়ে মন্তব্যের জন্য বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান ও ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরীফ হাসনাতের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনটি টিবিএস বাংলা থেকে নেওয়া