আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা হোসাইনি খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছে। অবশ্য তাকেও হত্যার হুমি দিয়ে রেখেছে ইসরায়েল। বুধবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এমন হুমকি দেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসন করা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন। হামলার সময় তিনি তার বাসভবনের ভেতরে ছিলেন। ওই হামলায় তার সঙ্গে তার মেয়ে, জামাতা এবং নাতনিও প্রাণ হারান। খামেনির স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, খামেনিকে পবিত্র শহর মাশহাদে দাফন করা হবে এবং রাজধানী তেহরানে একটি ‘বিশাল বিদায় অনুষ্ঠান’ আয়োজন করা হবে। তবে দাফনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি পর্দার আড়াল থেকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন বলে ধারণা করা হয়। ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ইরানের প্রভাবশালী আলেমদের পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বুধবার সকালেই এই ঘোষণা আসার সম্ভাবনা ছিল। তবে পরিষদের কোনো কোনো সদস্য মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী নেতা করার বিষয়ে কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই ঘোষণার ফলে তিনি সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি একজন প্রভাবশালী কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা ব্যক্তিত্ব। গত শনিবার মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই তার নাম জোরেশোরে আলোচনায় আসে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকেই নেতা বানানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি, বর্তমান সংকটময় সময়ে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ও নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা মোজতবার রয়েছে।
তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহেদী রহমতি বলেছিলেন, ‘মোজতবা বর্তমানে সবচেয়ে বিজ্ঞ পছন্দ, কারণ তিনি নিরাপত্তা ও সামরিক অবকাঠামো পরিচালনার বিষয়ে গভীরভাবে পরিচিত। তিনি ইতোমধ্যে এসবের দায়িত্বে ছিলেন।’ তবে রহমতি সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্তে সবাই সন্তুষ্ট হবে না। জনসাধারণের একটি অংশ এর তীব্র বিরোধিতা করতে পারে এবং এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যাদের সম্ভাব্য ইরানি নেতা হিসেবে মনে করত, তাদের অনেকেই শনিবারের পর থেকে নিহত হয়েছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নতুন কেউ ক্ষমতায় এলে তিনি হয়তো আগের নেতার মতোই খারাপ হতে পারেন।
উল্লেখ্য, ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেমকে নিয়ে গঠিত। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী তারাই সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ, তদারকি ও অপসারণের দায়িত্ব পালন করেন। ৪৭ বছরের ইতিহাসে এটি পরিষদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘটনা। এর আগে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে এই পরিষদই নির্বাচিত করেছিল।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা যাকেই নেতা বানাক না কেন, তিনি স্পষ্টভাবে আমাদের হত্যার লক্ষ্যে পরিণত হবেন। প্রধানমন্ত্রী (নেতানিয়াহু) ও আমি আইডিএফ-কে প্রয়োজনীয় সব উপায়ে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছি। এটি আমাদের ‘রোরিং লায়ন’ অভিযানের অংশ।’
কাটজ আরও বলেন, ‘তার নাম কী বা কোথায় তিনি লুকিয়েছেন তা আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমরা মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে মিলে শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ধ্বংস করতে এবং ইরানি জনগণের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরিবেশ তৈরি করতে পূর্ণ শক্তিতে কাজ চালাব।’
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, এই হামলার লক্ষ্য হলো ইরানি জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার মতো পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন—যেখানে প্রেসিডেন্ট আটক হলেও প্রশাসনের বেশিরভাগ অংশ বহাল ছিল।