মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে ছড়ানো মহাজাগতিক গ্যাসের জাল

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

মহাকাশ বিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর ছায়াপথ মিল্কিওয়ের একেবারে কেন্দ্রে ছড়িয়ে থাকা বিশাল এক মহাজাগতিক গ্যাসীয় জালের সবচেয়ে বড় ও বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির দাবি করেছেন তারা।

‘সেন্ট্রাল মলিকিউলার জোন’ নামের এ অঞ্চলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে য়েছে। মানচিত্রে দেখানো এ এলাকাটি ধনু রাশির দিকে অবস্থিত, যা পৃথিবী থেকে দেখলে চাঁদের প্রস্থের প্রায় তিন গুণ বড় মনে হবে। গবেষকরা আলমা টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া এ পর্যবেক্ষণের একটি ছবি প্রকাশ করেছেন।

রয়টার্স লিখেছে, এ মানচিত্রে দেখা গেছে, মহাকাশে সুতার মতো সরু কিছু কাঠামো প্রবাহিত হচ্ছে, যা দেখতে অনেকটা মহাকাশে বয়ে চলা বস্তুর নদীর মতো। এসব ‘নদী’ মাঝেমধ্যে এক জায়গায় মিলিত হয়ে এমন উজ্জ্বল মেঘের তৈরি করে, যেখানে নতুন নতুন তারা জন্ম নেয়।

চিলিতে অবস্থিত আলমা টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের গতিপ্রকৃতি ও রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করেছেন। এ অঞ্চলটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও শক্তিতে ভরপুর, যা নতুন তারা তৈরির কাঁচামালের এক বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে। এ অঞ্চলে গ্যাস ও ধূলিকণার ঘন মেঘ রয়েছে, যেখানে হাইড্রোজেনের আধিক্য বেশি। তবে এর পাশাপাশি সামান্য পরিমাণে হিলিয়াম ও অন্যান্য উপাদানও আছে। এখানকার তাপমাত্রা প্রচণ্ড শীতল, যা ‘পরম শূন্য’ তাপমাত্রার সামান্য ওপরে। এসব গ্যাস ও ধূলিকণা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নিজেদের ওপর ভেঙে পড়ে বা সংকুচিত হয় তখনই নতুন তারা জন্ম নেয়।

মিল্কি ওয়ের ঠিক মাঝখানে ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ নামের বিশাল এক ব্ল্যাক হোল রয়েছে। আলমা টেলিস্কোপের মাধ্যমে ছায়াপথের কেন্দ্রের প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা গেছে। এক আলোকবর্ষ এক বছরে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের সমান, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।

এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য, ছায়াপথের কেন্দ্রের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে গ্যাস জমাট বেঁধে তারায় পরিণত হয় তা খতিয়ে দেখা।

আরও পড়ুন  চা বাগানে আম চাষ, নাকি আম বাগানে চা!

জার্মানির ‘ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি’র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক অ্যাশলি বার্নস বলেছেন, “এই প্রথম আমরা সম্পূর্ণ অঞ্চলজুড়ে থাকা গ্যাসগুলোকে স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি। ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে গ্যাসের প্রবাহের সঙ্গে তারা তৈরি হওয়া ঘন মেঘের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। একইসঙ্গে তারার বিস্ফোরণ ও বিকিরণ কীভাবে এই পরিবেশকে নতুন রূপ দিচ্ছে তাও আমরা দেখছি।”

গবেষণাটি ‘মান্থলি নোটিশেস অফ দ্য রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ জার্নালে ছয়টি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে।

লিভারপুল জন মুরেজ ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার প্রধান গবেষক স্টিভেন লংমোর বলেছেন, “বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকার পরও এখানে আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক কম তারা তৈরি হচ্ছে, যা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় এক রহস্য।”

তিনি বলেন, “ছায়াপথের কেন্দ্রে এত বিপুল পরিমাণে এসব অণুর সন্ধান পাওয়া আমাদের ইঙ্গিত দেয়, এমন চরম প্রতিকূল পরিবেশেও শেষ পর্যন্ত প্রাণ তৈরিতে ভূমিকা রাখার মতো জটিল রসায়ন ভালোভাবেই টিকে রয়েছে।”