দ্বিতীয়বারের মত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্ধ ঘোষণা

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

শোষণ আর লুটপাটের কারণে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইতিহাসের কুখ্যাত এক নাম। প্রায় ১৫২ বছর আগে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা ঘটানো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্ধ হল দ্বিতীয়বারের মত।

পরে ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নিয়ে লন্ডনে এ কোম্পানিকে বিলাসপণ্যের খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করেন। দেউলিয়া হয়ে এবার বন্ধ হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেই আধুনিক সংস্করণও। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ এই কোম্পানির দীর্ঘ বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি জানা গেছে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে যায়। ১৮৫৮ সালে ভারতবর্ষে সরাসরি ব্রিটিশ রাজের শাসন শুরু হয়।

ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক অভিযাত্রায় এ কোম্পানি বিশ্ব বাণিজ্যের ধরণই বদলে দিয়েছিল। কিন্তু নিপীড়ন আর দুর্ভিক্ষের মত ঘটনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ভারতীয়দের জন্য নিয়ে আসে বিপুল দুর্ভোগ। বাংলার দুর্ভিক্ষে প্রায় তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কেনার চেষ্টা শুরু করেন একবিংশ শতকের শুরুর দিকে। ২০১০ সালে মেফেয়ারে ২ হাজার বর্গফুটের একটি দোকানে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুরু করেন। সেখানে উঁচুমানের চা, চকলেট, মিষ্টান্ন, মসলা ও অন্যান্য দামি পণ্য বিক্রি হত।

একজন ভারতীয় উদ্যোক্তা যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নিলেন, তখন অনেকেই একে সেই ঔপনিবেশিক অপশাসনের প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। বিষয়টি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।

ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সানডে টাইমস’ জানায়, অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর নিয়োগ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল গ্রুপের কাছে এ কোম্পানির দেনা জমেছিল ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি। এছাড়া কর বাবদ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের কাছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ পাউন্ড দায় জমেছিল।

আরও পড়ুন  দাম বেড়েছে এলপি গ্যাসের

কোম্পানির ওয়েবসাইট এখন অচল। লন্ডনের মেফেয়ারে ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে তাদের দোকানটি খালি পড়ে আছে। সেটি ভাড়া দেওয়ার জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে।

সঞ্জীব মেহতার মালিকানায় থাকা আরেক কোম্পানি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেকশনস লিমিটেডও দেউলিয়া হয়ে গেছে।

২০১৭ সালে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক—এটাই প্রমাণ করে যে নেতিবাচক বিষয়টি এখন ইতিবাচক হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।’

উল্লেখ্য, ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের জারি করা ফরমানের মাধ্যমে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬১২-১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের সুরাটে প্রথম বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করে। পরে কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার পেয়ে যায়।

অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে ব্যাপক প্রভাবশালী এক শক্তিতে পরিণত হয় এ কোম্পানি। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সমঝোতা এবং ফরাসিদের মত প্রতিদ্বন্দ্বী ঔপনিবেশিক শক্তি আর স্থানীয় রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব বাড়তে থাকে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর তারা বাংলার মত অঞ্চল শাসনের সুযোগ পেয়ে যায়। কর আদায়, আদালত পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। এক পর্যায়ে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

তবে শোষণ, নীলের মত অর্থকরী ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানিনির্ভর নীতির কারণে দুর্ভিক্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। পরে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ রাজের হাতে চলে যাওয়ার পর ১৮৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয় এ কোম্পানি।

প্রতিবেদনটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে নেয়া।

  • অর্থনীতি
  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
  • দ্বিতীয়বারের মত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্ধ ঘোষণা
  • বাণিজ্য
  • সঞ্জীব মেহতা