স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো ইউক্রেনকে দুই দিনের আলটিমেটাম বা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইউক্রেন যদি তাদের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে রুশ তেল সরবরাহ চালু না করে, তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
গত শনিবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এই হুঁশিয়ারি দেন ফিকো। তিনি বলেন, সোমবারের মধ্যে সোভিয়েত আমলের ‘দ্রুজবা’ পাইপলাইন দিয়ে রুশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু না হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ‘এসইপিএস’-কে তিনি ইউক্রেনে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে বলবেন।
প্রায় চার বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকে স্লোভাকিয়া এবং প্রতিবেশী হাঙ্গেরি রুশ তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জানুয়ারির শেষের দিকে ইউক্রেন জানায়, রাশিয়ার ড্রোন হামলায় তাদের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এরপর থেকেই দুই দেশ পাইপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহ চালুর জন্য কিয়েভকে চাপ দিচ্ছে।
স্লোভাক নেতা ফিকো অভিযোগ করেছেন, জেলেনস্কি তার দেশের সঙ্গে ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ আচরণ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রানজিট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেন রুশ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। ফিকোর দাবি, এতে স্লোভাকিয়ার বছরে ৫০ কোটি ইউরো (৫৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার) ক্ষতি হচ্ছে।
জেলেনস্কির এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য আচরণ’ আখ্যা দিয়ে ফিকো বলেন, ইউক্রেনকে ৯ হাজার কোটি ইউরোর (১০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) সামরিক ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্লোভাকিয়াকে যুক্ত না করার সিদ্ধান্তটি ‘একেবারে সঠিক’ ছিল।
রাশিয়ার হামলায় গ্রিড বা সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেনের বিদ্যুতের বড় উৎস হয়ে উঠেছে স্লোভাকিয়া। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, গত মাসে ইউক্রেন রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করেছে, যার ১৮ শতাংশই এসেছে স্লোভাকিয়া থেকে।
ইইউ ঋণ নিয়ে শঙ্কা
হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র—তিনটি দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সুদবিহীন ঋণ প্যাকেজের বিরোধিতা করেছিল। গত ডিসেম্বরে সদস্য দেশগুলো এই ঋণে সম্মত হয়েছিল, যা আগামী দুই বছরে ইউক্রেনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে সাহায্য করার কথা।
রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ ব্যবহারের বিতর্কিত পরিকল্পনা আইনি বাধায় আটকে গেলে এই ঋণের প্যাকেজটি আনা হয়। তখন একটি সমঝোতা হয়েছিল যে, এই তিনটি দেশ এতে বাধা দেবে না এবং কোনো আর্থিক ক্ষতি হলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে।
তবে রুশ তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়া নিয়ে উত্তেজনা বাড়ায় শুক্রবার হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান হুমকি দিয়েছেন যে তিনি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে ডিসেম্বরের ওই চুক্তি উল্টে দেবেন।
ফেসবুকে হাঙ্গেরির নেতা লিখেছেন, ‘যতদিন ইউক্রেন দ্রুজবা পাইপলাইন আটকে রাখবে, ততদিন হাঙ্গেরি ইউক্রেনের ৯ হাজার কোটি ইউরোর যুদ্ধ ঋণ আটকে রাখবে। আমাদের কেউ ধমকাতে পারবে না!’
উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি এর থেকে সাময়িক ছাড় পেয়েছিল।
ইউক্রেনের জবাব
শনিবার ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জ্বালানি ইস্যুতে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির এই ‘আলটিমেটাম এবং ব্ল্যাকমেইল’-এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এই দুই দেশ ‘আগ্রাসীর (রাশিয়া) স্বার্থেই কাজ করছে’।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দ্রুজবা পাইপলাইনে ‘রাশিয়ান হামলার’ ফলে কী ক্ষতি হয়েছে, তা তারা হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়াকে জানিয়েছে এবং মেরামতের কাজ চলছে।
ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা এই দেশগুলোতে রাশিয়ার বদলে অন্য কোনো উৎসের তেল সরবরাহের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ‘বিকল্প প্রস্তাবও’ দিয়েছে।