রোজার প্রথম দিনে প্রতিবছরই কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায়। গেল বছর সেই ধারায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও এবার পুরনো চিত্র ফিরেছে বাজারে।রোজার শুরুতেই বাজারে লেবুসহ কয়েকটি সবজির দাম বেড়েছে; যা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালী ও সাত তলা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মুরগি ও গরুর মাংসের দাম।
কাঁচাবাজারের পণ্যের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় লেবু। গেল সপ্তাহে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা হালিতে বাজারে লেবু পাওয়া যেত। কিন্তু, বৃহস্পতিবার সেটি দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছিল। দেশি কাগজি লেবুর তুলনায় এলাচি লেবুর দাম বাজারে বেশি।
সাত তলা কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মো. শাহজাহান অন্যদিন ডেকে-ডেকে লেবু বিক্রি করেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাজারে গিয়ে দাম জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন এক বাক্যে, ‘একদাম ৮০ টাকা হালি।’
দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিরক্ত হয়ে ভ্রু-কুঁচকে তাকান শাহজাহান।
একই বাজারের সবজি বিক্রেতা জেসমিন বলছিলেন, “রোজার আগে লেবুর দাম বেড়েছে। আমাদের কেনাই বেশি, তাই বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে।
রোজায় অনেকে ইফতারিতে লেবুর শরবত পান করেন। ইফতারিতে মুড়িমাখা, হালিম বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গেও লেবু পছন্দ করেন অনেকে। ফলে, এই ফলের চাহিদা বেড়েছে বাজারে।
লেবুর দাম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি হাস্যরস তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ফেসবুকে কেউ কেউ মজা করে লিখছেন, “আপনার এলাকায় লেবুর ভরি কত?”, কেউ আবার জানতে চাইছেন লেবু ছাড়া শরবত বানানোর রেসিপি।
মহাখালী কাঁচাবাজারেও একইদামে লেবু বিক্রি হচ্ছিল। পাকা লেবু ১০০ টাকা হালি দরে কিনতে গিয়ে বিরক্ত বেসরকারি চাকরিজীবী মো. ইফতেখার হোসেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মনে হচ্ছে এই দুদিনে লেবুতে ভিটামিনের মাত্রা বেড়ে গেছে। আর নইলে আমরা বোকা। ১০০ টাকা হালি দিয়ে লেবু কিনে অন্তত তাই মনে হচ্ছে।”
বেড়েছে সবজির দাম, ছোলা-বেসনে নড়চড় নেই
গেল সপ্তাহে বাজারে গোল বেগুন বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। অথচ, মঙ্গলবার বাজারে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। আর, গেল সপ্তাহে ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া লম্বা বেগুন বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকায়।
সাত তলা কাঁচাবাজারে বেগুন কিনছিলেন মুরাদ হোসেন নামের একজন। তিনি বলেন, “রোজায় বেগুনি বানাতে বেগুনের প্রয়োজন হয়। এজন্য সারা বছর অনেকে না কিনলেও রোজায় বেগুন কেনে। তাই দাম বাড়তি। মোট কথা চাহিদা বাড়লেই বাজারে দাম বাড়বেই যেকোনো অজুহাতে।”
বাজারে দাম বেড়েছে কাঁচা পেঁপের। অনেকে পেঁপে দিয়েও বেগুনি বানিয়ে থাকেন। তুলনামূলক সস্তা এই সবজি সারা বছর ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকার ঘরে থাকলেও কাঁচা পেঁপের দাম এখন কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
শসা কিনতে হচ্ছে মানভেদে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। গেল সপ্তাহেও যা ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এছাড়া, টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০ টাকা করে বেড়েছে।
পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচের মতো নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং কাঁচা মরিচের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে, রোজার পণ্য ছোলা আগের দামেই মানভেদে ৮০ থেকে ৯৫, অ্যাংকর ডাল ৫০ থেকে ৭৫ টাকা, মুগডাল ১২০ টাকা কেজিতেই স্থিতিশীল রয়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আল-আমিন বলেন, “ছোলা আজ বিক্রি করছি ৯০ টাকায়। এ বছর এখনো এখন পর্যন্ত ছোলা, অ্যাংকর ডাল, বেসন এসব জিনিসের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।”
ব্রয়লারের ‘ডাবল সেঞ্চুরি’
বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটায় এই ব্রয়লার মুরগি।
গেল সপ্তাহে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। বৃহস্পতিবার বিক্রি হচ্ছিল ২০০-২২০ টাকা কেজিতে।
সপ্তাহের ব্যবধানে অন্যান্য মুরগির দামও কেজি প্রতি ২০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজেরের মুরগি বিক্রেতা মো. হামিদ বলেন, প্রতি কেজি সোনালি মুরগি সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া, দেশি মুরগি গেল সপ্তাহে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এদিন বিক্রি হচ্ছিল ৭০০ থেকে ৭২০ টাকায়।
এছাড়া গরুর মাংস গেল সপ্তাহে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় বিক্রি হলেও রোজার প্রথম দিনে বিক্রি হচ্ছিল ৭৯০ থেকে ৮০০ টাকায়।
ফলের দামও চড়া
রোজায় ইফতারে ফলে খেতে চান অনেকে। ফলে, রোজায় বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ফলের দাম থাকে বাড়তি। রোজা শুরুর আগেই এবার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফলের দাম বেড়েছে।
বিদেশি ফলের মধ্যে রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মাল্টা ও আপেলের।
বৃহস্পতিবার এক কেজি মাল্টা ১০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে মানভেদে ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর, আপেলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে সবুজ আপেল ৩৫০ টাকা, গালা আপেল ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা, ফুজি আপেল ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিদেশি কোনো ফলই বাজারে ৩০০ টাকার কমে মিলছে না। দুই সপ্তাহ আগেও মাল্টা ও আপেলের দাম কেজিতে গড়ে ৫০ থেকে ৮০ টাকা কম ছিল।
এছাড়া, লাল আঙুর কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা, কালো আঙুর কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
বাজারে দেশীয় ফলের মধ্যে ধরনভেদে কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া পেঁপে, পেয়ারা, বরই প্রভৃতি ফল আগের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে নেওয়া