নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন; মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা চান প্রধানমন্ত্রী

লেখক: প্রতিধ্বনি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ঘন্টা আগে

সরকারের দায়িত্ব নিয়েই রমজানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি আগামী ১৮০ দিনে নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। এ সভার পরে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা সচিবদের সাথেও বৈঠক করেন।

গতকাল সরকারের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীসহ পুরো মন্ত্রিসভা ব্যস্ত সময় পার করেছে। সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পনের পর দুপুরে সচিবালয় আসেন মন্ত্রীরা। কোনো কোনো মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে এসেই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রথমে। আবার অনেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বিকাল তিনটায় সবাই যোগ দেন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে। কোনো কোনো মন্ত্রী এই বৈঠকের পরে বিকালে মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। শুভেচ্ছা বিনিময়, পরিচিত হওয়া এগুলোও ছিল দপ্তরে দপ্তরে।

জানা গেছে, সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনকে গতিশীল করার ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সময়মতো বাস্তবায়ন হতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংযোগ বা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে কর্মকর্তাদের দক্ষতার সাথে কাজ করতে হবে বলে জানিয়েছেন। এছাড়া সরকারি দলের নির্বাচনি ইশতিহারে থাকা ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি কীভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তার পরিকল্পনা চেয়েছেন সচিবদের কাছে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যাতে কোনো সংকট সৃষ্টি না হয়—গ্যাস ও বিদ্যুতের দিকে লক্ষ রাখা, এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, প্রত্যেকটা সরকার প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি নেয়। আমাদের সরকার সেই কর্মসূচিটি একটু বৃহত্তর পরিসরে ১৮০ দিনের জন্য গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।’

আরও পড়ুন  একক ভিসায় ভ্রমণ করা যাবে জিসিসিভুক্ত ৬ দেশ

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য, আইন-শৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সবক্ষেত্রেই জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য যার যার জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।’ তিনি আরও জানান, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনাটি খুব দ্রুত মন্ত্রিপরিষদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘জনগণের জন্য প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। বিএনপি মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো মনে রেখে মন্ত্রণালয়গুলোকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।’

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ইফতার ও তারাবিতে যেন কোনো কষ্ট না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তাদের কর্মপরিকল্পনা দু-একদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী আমরা আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’

তথ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। এই কর্মসূচি শুধু বিএনপির ছিল না, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সব দল এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, রমজানে যেসব চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, সেগুলো যাতে ঠিকভাবে মোকাবিলা করা সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এটা আসলে কেবিনেট মিটিং ছিল না। এটা একটা সৌজন্যমূলক মিটিং ছিল, যেখানে মন্ত্রীরা ও উপদেষ্টারা ছিলেন। উপদেষ্টারা কেবিনেটের পার্ট না, এ কারণেই এটা ফর্মাল মিটিং না।’

সচিব কমিটির সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

সচিবদের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির নির্বাচনি ইশতিহারে ঘোষণা করা ফ্যামিলি কার্ড দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জানান। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তাকে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে সমস্যায় পড়তে হবে না বলে অভয় দেন। কিন্তু কর্মকর্তাদের কাজের দক্ষতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না বলেও জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যার যেখানে দক্ষতা আছে, তিনি সেখানে কাজ করবেন।

আরও পড়ুন  হুইসেল বাজানোর অপেক্ষায় ভোটের ট্রেন, অনুমতি ছাড়া সভা-সমাবেশে না

বৈঠকে উপস্থিত একজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের আলোচনার সময় বর্তমানে চালু থাকা সরকারের বিভিন্ন কার্ড বা ভর্তুকি সুবিধার কথা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড, ভিজিএফ, ওএমএসের তথ্য জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কারোর সুবিধা বন্ধ বা স্থগিত করা হবে না। কিন্তু এত আলাদা আলাদা সেবার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় সবাইকে কীভাবে, কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনামুলক রিপোর্ট চেয়েছেন।’

সরকারের সব সচিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের বলেছেন, জনগণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। সুতরাং, সংবিধান ও আইনবিধি অনুযায়ী ওই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচিবেরা আন্তরিক হবেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সবাইকে আমরা বলেছি, কে, কার কী অ্যাফিলিয়েশন (সম্পৃক্ততা) আছে, সেটি আমরা দেখব না। আমরা মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই করব।’

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনগণ রায় দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহার দেখে। নিশ্চয় তারা ইশতেহারকে পছন্দ করেন। সেই ইশতেহার যেন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পূরণ হয়, সেজন্য সব সচিবের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

আরেকজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকার যে পরিকল্পনা নেবে, সেগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সমস্যা থাকলে সেটি আগে জানাতে হবে, কিন্তু কোনো পরিকল্পনা নেওয়ার পরে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা যাবে না।’