ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে কয়লার দাম ও বিদ্যুতের ট্যারিফ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) চলমান মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পক্ষে লড়তে একটি ব্রিটিশ আইনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি হলো ‘৩ ভেরুলাম বিল্ডিংস’ (৩ভিবি)। এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক ও আর্থিক মামলার ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে।
কর্মকর্তারা টিবিএসকে জানান, আদানির বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন ৩ভিবির কিংস কাউন্সেল ফারহাজ খান। তিনি গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন।
তাকে সহায়তা করার জন্য বিপিডিবি দুজন স্থানীয় বিশেষজ্ঞও নিয়োগ দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রমতে, তারা হলেন—পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান রেজওয়ান খান (কারিগরি বিশেষজ্ঞ) এবং ‘দ্য ল কাউন্সিল’-এর পার্টনার ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক (আইনি বিশেষজ্ঞ)।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম টিবিএসকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের নাম ইতিমধ্যেই বিপিডিবির পক্ষ থেকে এসআইএসিতে জমা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক টিবিএসকে বলেন, তিনি এখনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র পাননি, তাই মন্তব্য করতে চান না। তবে আদানি চুক্তি পর্যালোচনার সময় তিনি আইনি মতামত দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন।
অন্যদিকে রেজওয়ান খান জানান, তাকে কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, তবে লিখিত নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় আছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা এর আগে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য তার সম্মতি চেয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত, এসআইএসি এশিয়ায় আন্তর্জাতিক সালিশি নিষ্পত্তিতে বিশেষায়িত একটি শীর্ষস্থানীয়, স্বাধীন ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো নিয়ে গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পাঁচ দিনের মধ্যেই এই নিয়োগ দেওয়া হলো।
এদিকে, পৃথক একটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত কানাডীয় জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে ২০০৫ সালের ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান টিবিএসকে জানান, ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুটস (আইসিএসআইডি)-এর এই রায় কয়েক দিন আগে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে।
বিপিডিবি বনাম আদানি
বিপিডিবি ও আদানি পাওয়ার ২০১৭ সালের নভেম্বরে ২৫ বছর মেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের এপ্রিলে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
২০২৫ সালের ২১ মে এক চিঠিতে আদানি পাওয়ারের প্রেসিডেন্ট কৃষ্ণা রাও চুক্তির ১৯.৩ ধারা উল্লেখ করে বিপিডিবিকে ১৫ দিনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে সালিশি শুরুর আহ্বান জানান। আদানি চারজন আন্তর্জাতিক সালিশি বিশেষজ্ঞের নাম প্রস্তাব করেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন লরেন্স বু, লুসি রিড, টবি ল্যান্ডাউ কেসি এবং ভি কে রাজা এসসি।
বিতর্কিত কয়লা ট্যারিফের সাথে যুক্ত প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পাওনা দাবি করে গত বছর সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশনে সালিশি প্রক্রিয়া শুরু করে আদানি পাওয়ার। চুক্তি অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ সালিশের আগে মধ্যস্থতা একটি বাধ্যতামূলক কিন্তু প্রতিপালনে বাধ্যবাধকতাহীন (নন-বাইন্ডিং) ধাপ।
বাংলাদেশের যুক্তি হলো, আদানি কয়লার অত্যধিক দাম ধরছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিপিডিবি আদানির সঙ্গে পুনরায় আলোচনার প্রচেষ্টা জোরদার করে।
কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক অনলাইন বৈঠক কোনো ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হলে আদানি বিপিডিবিকে পুনরায় মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের অনুরোধ জানায়। জবাবে বিপিডিবি বলেছিল, জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি তাদের মূল্যায়ন শেষ না করা পর্যন্ত মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে না।
আদানির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান
গত ২৫ জানুয়ারি পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কমিটির সদস্য মোস্তাক হোসেন খান দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন যে, দেরি হলে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
কমিটি বলছে, কয়লার মূল্য নির্ধারণী সূত্র ও কর সংক্রান্ত বিধানের ত্রুটির কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার গুনতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাউজুল কবির খান বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।
কমিটির তথ্যমতে, তদন্তকারীরা বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের নথিভুক্ত করেছেন, যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর, তারিখ, সময় এবং সুবিধাভোগীদের রেকর্ড রয়েছে।
সদস্যরা জানান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন কিংস কাউন্সেলর নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের একটি দল স্বাধীনভাবে এসব প্রমাণ পর্যালোচনা ও যাচাই করেছে।
আইনি দলটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, অভিযোগকৃত ঘুষ ও দুর্নীতির দায়ে আদানি পাওয়ারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করার জন্য বাংলাদেশের হাতে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে বাংলাদেশকে
নাইকো মামলার ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, তবে ট্রাইব্যুনাল অনেক কম পরিমাণ মঞ্জুর করেছে।
পেট্রোবাংলা এখনো পূর্ণাঙ্গ রায় পায়নি, তবে একটি সারসংক্ষেপ পাওয়া গেছে এবং মঙ্গলবার বাপেক্সের বোর্ড সভায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আইনি মতামতের জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
২০০৩ সালে ফেনী ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ চুক্তি স্বাক্ষর করে নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড, যেখানে পেট্রোবাংলা ফেনী থেকে গ্যাস কিনতে সম্মত হয়।
২০০৫ সালে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের কার্যক্রম ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, যখন দুটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে (ব্লো-আউট) প্রাণহানি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং গ্যাসক্ষেত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
পরবর্তীতে সরকারি তদন্তে নাইকোর খননকাজে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায়, যার ফলে পেট্রোবাংলা আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবি করে।
পরিবেশ ধ্বংস ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ বাপেক্সের জন্য ১১৮ মিলিয়ন ডলার এবং সরকারের জন্য আরও ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল।
প্রতিবেদনটি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে নেওয়া্